দেশের স্বাধীনতা সুরক্ষায় মহানবী (স)

0
284

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
মহানবী (স) একটি স্বাধীন ভূখ-ের জন্য অনেক ত্যাগ-সাধনা করেছেন। এমনকি সাহাবায়ে কিরামদের নিয়ে হিজরত করে মদীনাকে একটি স্বাধীন ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে গঠন করেন। এ স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে তিনি তাঁর দাওয়াতি মিশনকে আরো তীব্র গতিতে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে মক্কা বিজয় সূচিত হয়। যার মধ্য দিয়ে এ স্বাধীনতার বিস্তৃতি ও পরিধি আরো বৃদ্ধি পায়। স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিতকে মজবুত করার নিমিত্তে মদীনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলমান, ইহুদী, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিকদের নিয়ে সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের মানবিক ও ধর্মীয় অধিকারকে সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেন- যা ‘মদীনা সনদ’ নামে খ্যাত। একটি স্বাধীন কল্যাণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এটিই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র। এ সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ। এছাড়া জনগণের চিন্তা ও মতামত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ প্রদান করে তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বতোরূপে প্রতিষ্ঠা করেন।
রাসূলুল্লাহ (স) প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র মদীনায় ধর্ম-বর্ণ-দল-মত নির্বিশেষে সবার ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছিল। ফলে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর লোকদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব হয়। তিনি মদীনার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার জন্য সব রকমের ব্যবস্থা করেছেন, এমনকি অনেক আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন। নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করাকে তিনি শুধু উদ্বুদ্ধই করেননি, সার্বভৌমত্ব অর্জন ও রক্ষায় জীবনদানকে শাহাদতের মর্যাদা দিয়ে বলেছেন, ‘শহীদের রুহুগুলো জান্নাতে পরিভ্রমণ করতে থাকে এবং সেখানকার ফল ও নিয়ামতগুলো আহার করে।’
দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে পারা গৌরবের বিষয়- এ সুশিক্ষাই মহানবী (স) মানব জাতিকে দিয়ে গেছেন। তিনি যখন বিজয়ীবেশে জন্মভূমি মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন তাঁর স্বগোত্রীয় লোকেরা অপরাধী হিসেবে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো। এমনি মুহূর্তে স্বদেশবাসীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বিশ্বের ইতিহাসে তিনি অতুলনীয় দেশপ্রেম, উদারতা ও মহানুভবতার অনুপম আদর্শ স্থাপন করেন। অতঃপর সামান্য সময়ের ব্যবধানে পুরো আরব ভূখ-কে অবারিত শান্তি ও নিরাপত্তায়, অভূতপূর্ব শৃঙ্খলায়, অপূর্ব সুষম বণ্টনে, অবর্ণনীয় ভ্রাতৃত্ববোধে এবং স্বপ্নাতীত কল্যাণে ভরে দিয়েছিলেন। ফলে সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেক নাগরিক স্বাধীনতার আস্বাদন ভোগ করতে থাকে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুফল পেতে থাকে।
স্বাধীন দেশে বহিঃশত্রর আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য মহানবী (স) সুসংগঠিত, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও ঈমানের বলে বলীয়ান এমন একটি সেনাবাহিনী গঠন করেন- যারা স্বদেশের মাটির জন্য, মানুষের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে সদা প্রস্তুত থাকত। এভাবে যারা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশকে ভালোবাসে, যারা দেশের পাই ইঞ্চি সীমানা রক্ষার জন্য ত্যাগ স্বীকার করে তাদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘একদিন ও একরাতের সীমান্ত পাহারা ধারাবাহিকভাবে এক মাসের সিয়াম সাধনা ও সারারাত নফল ইবাদতে কাটানো অপেক্ষা উত্তম।’ (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুমহান জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি একে অর্থবহ করতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ দলমত নির্বিশেষে দেশের উন্নয়নে সব নাগরিকের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করা উচিত। তাহলেই স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী প্রত্যেক শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মা শান্তি পাবে।
লেখক: অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান,
ইনস্টিটিউট অব ল্যাংগুয়েজ স্টাডিজ, বাংলাদেশ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here